বুধবার, ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:২৯ অপরাহ্ন
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম ৯মাসের তুলনামূলক পারফরম্যান্স রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।
মোঃ শাহরিয়ার রিপন ঃ- চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, কার্গো হ্যান্ডলিং, কন্টেইনার পরিবহন এবং জাহাজ আগমনের সংখ্যা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বন্দরটি উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
কার্গো হ্যান্ডলিং: ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ধারাবাহিক উন্নতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে অক্টোবর ২০২৫ মাসে পণ্য পরিবহনে রেকর্ড ২১.১১% প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। অর্থনীতি স্থিতিশীল হওয়া এবং জ্বালানি ও কাঁচামাল আমদানি বৃদ্ধির ফলে এই সাফল্য এসেছে। দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম নয় মাসে ১০,৪২,৯৮,৬৫৮ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৭.৩৯% বেশি। Cargo Handling for 1st 09 months.png
কন্টেইনার হ্যান্ডলিং (টিইউএস):কন্টেইনার পরিবহনের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগস্ট মাসে ২০.১০% এবং সেপ্টেম্বর মাসে ১০.২২% প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়েছে। টার্মিনাল ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন এবং অটোমেশনের ফলে কন্টেইনার জট কমেছে এবং দ্রুত পণ্য খালাস সম্ভব হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় পাওয়া যায় যে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম নয় মাসে ২৫,৭২,৩৪৬ TEUs কন্টেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৭৫% বেশি।
Container Handling for 1st 09 months.png
জাহাজ হ্যান্ডলিং: বন্দরে জাহাজের গড় অবস্থানের সময় (Turnaround Time) ৪ দিন থেকে কমিয়ে ২.৫৩ দিনে আনা হয়েছে। ফলে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ৩৯১টি জাহাজ হ্যান্ডল করা সম্ভব হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৬.০২% বেশি।এছাড়া, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১ম নয় মাসে মোট ৩,২৩০টি জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে, যা ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৫.৬২% বেশি।
Vessel Handling for 1st 09 months.png
সাফল্যের মূল কারণসমূহ:
ব্যবস্থাপনায় দক্ষ নেতৃত্ব: চবক-এর বর্তমান চেয়ারম্যানের দূরদর্শী নেতৃত্বে একটি গতিশীল ও কার্যকর টিম বন্দর পরিচালনায় আমূল পরিবর্তন সাধিত করেছে। এর পাশাপাশি ২০২৫ সালের ৭ জুলাই নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (NCT) চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেডের (বাংলাদেশ নৌবাহিনী দ্বারা পরিচালিত) কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই পদক্ষেপের ফলে বন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ত এই টার্মিনালে কর্মদক্ষতা ১২-১৪% বৃদ্ধি পেয়েছে।
আধুনিকায়ন ও অটোমেশন: অনলাইন ই-গেট পাস সিস্টেম চালু এবং টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের (TOS) পূর্ণ বাস্তবায়ন কাগজের নথিপত্র সংক্রান্ত বিলম্ব এবং ইয়ার্ডের যানজট কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ২০২৫ সালের শেষ দিকে অনেক দিনই জাহাজগুলোকে জেটিতে ভিড়তে কোনো সময় অপেক্ষা করতে হয়নি (জিরো ওয়েটিং টাইম)।
কার্গো হ্যান্ডলিং বৃদ্ধি (অক্টোবর ২০২৫): কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ২১.১% প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাল্ক কার্গো (জ্বালানি, গম এবং কাঁচামাল আমদানি) পরিবহনে ১৩.২% বৃদ্ধির কারণে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া এবং পূর্ববর্তী ডলার সংকট কাটিয়ে অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়া এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
ছুটির দিনেও নিরবিচ্ছিন্ন সেবা (মার্চ ২০২৬):ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটি সত্ত্বেও বন্দর ২৪/৭ কার্যক্রম চালু রেখেছিল। শুধুমাত্র এক সপ্তাহে (১৭-২৩ মার্চ) বন্দরটি ২৫ লক্ষ টন কার্গো এবং ৫৫,০০০ টিইউএস (TEUs) কন্টেইনার হ্যান্ডল করেছে, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ চেইন সচল রাখতে সাহায্য করেছে।
কার্যকরী দক্ষতা: একটি জাহাজ বন্দরে অবস্থানের গড় সময় ৪ দিনের বেশি থেকে কমে ২.৫৩ দিনে নেমে এসেছে। এর ফলে ২০২৪-২৫ সময়ের তুলনায় বন্দরটি প্রতিমাসে অনেক বেশি সংখ্যক জাহাজ হ্যান্ডল করতে সক্ষম হয়েছে।
জিরো ওয়েটিং টাইমঃ চট্টগ্রাম বন্দর ঈদের ছুটির বন্ধেও ২৪/৭ তাদের অপারেশনাল কার্যক্রম চালু রেখেছিল। ঈদের আগে জাহাজের ওয়েটিং টাইম ৩ থেকে ৫ দিনে উন্নিত হলেও কর্তৃপক্ষের সার্বিক মনিটরিং এবং সমন্বয়ের ফলে আউটার অ্যাংকরেজে জাহাজের অপেক্ষমান সময় পুনরায় ০(শুন্য) দিন অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এতে জাহাজ দ্রুত পণ্য লোড আনলোড করে চলে যেতে পারে। লজিস্টিকস খরচ কমে যাওয়ার ফলে পণ্যের বাজার মূল্য কমে যায়, ভোক্তারা কম মূল্যে তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পন্যাদি ক্রয় করতে পারে।
ডিজিটাল ই-বিলিং এবং পেমেন্ট সিস্টেম: চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজিটাল ই-বিলিং এবং পেমেন্ট সিস্টেমের প্রবর্তন আর্থিক লেনদেন প্রক্রিয়াকে সহজতর করার মাধ্যমে বন্দর কর্তৃপক্ষের কার্যক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করেছে। এই ডিজিটাল ব্যবস্থা প্রচলিত কাগজের বিলিং পদ্ধতির অবসান ঘটিয়েছে, যার ফলে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং শিপিং এজেন্টদের ভোগান্তি কমেছে এবং তারা যেকোনো স্থান থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বকেয়া পরিশোধ করতে পারছেন।
CPA Sky’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ‘CPA Sky’ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মটি একটি ‘পোর্ট সিঙ্গেল উইন্ডো’ হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে রপ্তানি-আমদানি, কাস্টমস এবং এনবিআর-এর সকল সেবা একটি সমন্বিত স্বয়ক্রিয় ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে এসেছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সশরীরে অফিসে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে, যার ফলে পণ্য খালাসের সময় কয়েক দিন থেকে কমে মাত্র ৩০ মিনিটে নেমে এসেছে।
Pre Arrival Process (PAP): বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই বর্তমানে PAP ব্যবহার করে শুল্কায়ন সম্পন্ন করা হয়। এই পদ্ধতিতে, জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার পূর্বেই – আমদানি কারক কর্তৃক দাখিলকৃত আমদানিকৃত পন্যের বিবরণের উপর ভিত্তি করে ASYCUDA SYSTEM এর Risk Management Module ব্যবহার করে Customs কতৃক শুল্ক আদায় করা হয়। এর ফলে আমদানিকৃত পণ্য / কন্টেইনার জাহাজ হতে Unload হবার পর বন্দরে পড়ে থাকতে হয় না। ফলে বন্দরের Efficiency বৃদ্ধি পায় এবং স্বল্পতম সময়ে পণ্য Unload এবং ডেলিভারি দেয়া যায়।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আশাবাদী যে, চলমান আধুনিকায়নের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হলে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির এই ধারা আরও শক্তিশালী হবে।